যক্ষ্মারােগ প্রতিরােধ করুন – দেখুন কারণ, লক্ষণ ও প্রতিকার সম্পর্কে আমাদের যা যা জানা দরকার

যক্ষ্মারােগ:

যক্ষ্মারােগ একটি ব্যাকটেরিয়া রোগ যেটি বছরে প্রায় লক্ষ লক্ষ মানুষ কে মেরে ফেলছে। যক্ষ্মারােগ  এর জীবাণু শ্বাস-প্রশ্বাস মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে এবং সেখানে বংশ বৃদ্ধি করে।

 জীবাণু :

মাইকোব্যাকটেরিয়াম টিউবারকিউলােসিস ।

যক্ষ্মারােগ সংক্রমণ :

যক্ষ্মারােগীর কফ , কাশি , হাঁচি এবং জোরে কথা বলার সময় বীজাণুনাক দিয়ে মুখ দিয়ে ফুসফুসে যায় । বীজাণু ছড়ায় । রােগীর কফে ( থুতুতেনয় ) জীবাণু থাকে । সেই কফই যক্ষ্মা রােগ ছড়ায় । যক্ষ্মা দেহের নানা অংশে হতে পারে । তবেযক্ষ্মা বলতে ফুসফুসের যক্ষ্মাই বােঝায় । রােগীর ব্যবহৃত বিছানা বা পােশাকেও কফ লেগে থাকতে পারে ও তার থেকে রােগ সংক্রমণ হতে পারে ।

*রােগ প্রকাশের সময় নির্দিষ্ট কিছু নয় । জীবাণু শরীরে প্রবেশের পর ৩ মাস থেকে ১ বছরের মধ্যে রােগ লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

প্রতিরােধ ক্ষমতা :

  • জন্মগত
  • অর্জিত – যক্ষ্মারােগী দের সংস্পর্শে এসে অর্জিত হয় ।
  • যে সমাজে যক্ষ্মারােগীর সংখ্যা বেশি সেই সমাজের মানুষের মধ্যে এই প্রতিরােধ ক্ষমতা জন্মায় । B.C.G , টিকা দিয়েও হয় ।
পরিবেশ :

দরিদ্র , অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ , ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা , একঘরে অনেক লােকের বাস ; ধুলি , ধোয়াযুক্ত এলাকা অর্থাৎ শিল্পাঞ্চল প্রভৃতি পরিবেশে এই রােগ বেশি হয় ।

রােগারম্ভ ( Onset ) :

খুব ধীরে ধীরে । অনেক সময় রােগী বুঝতেই পারে না তার যক্ষ্মা হয়েছে । হঠাৎ X – Ray করলে ধরা পড়ে ।

প্রাথমিক লক্ষণ :

  • ক্রমশঃ শরীর দুর্বল ও রােগা হতে থাকে ।
  • ক্ষুধামান্দ্য হয় ।
  • শরীরে অবসাদ দেখা দেয় ।
  • অম্বল শুরু হয় ।
  • বিকালের দিকে মাথা ধরে ।
  • বিকালের দিকে সামান্য জুরভাব বা ৯৯ ফাঃ জ্বর হয় ।
  • কোন কাজে উৎসাহ থাকে না ।
  • রুটিন কর্তব্যে অনিচ্ছা ।
  • কোন কোন ক্ষেত্রে সামান্য কাশি হয় ।
  • কোন কোন ক্ষেত্রে কফের সঙ্গে রক্ত পড়ে ।

তারপর শুরু হয় :

  • কাশি ও কফ – কাশির সঙ্গে প্রচুর কফ ।
  • নিয়মিত সন্ধ্যায় জ্বর ।
  • দেহ ক্ষীণ ও ভয়ানক দুর্বল হয় ।
  • ক্ষুধামান্দ্য বাড়ে ।
  • কফের সঙ্গে রক্ত পড়ে ।
  • বুকে বেদনা হয় ।
  • নাড়ির গতি দ্রুত হয় ।
  • প্রশ্বাস দ্রুত হয় ।
  • শ্বাসকষ্ট দেখা দেয় ।
  • স্টেথােস্কোপ দিয়ে বুক পরীক্ষা করলে বুকে কুরকুর শব্দ ( Crepitations ) পাওয়া যেতে পারে ।
রােগ নির্ণয় :প্রাথমিক স্তরে রােগ নির্ণয় করা প্রয়ােজন ।

 

১। রােগ লক্ষণ –

বিশেষতঃ জ্বর , কাশি ও কফে রক্ত ।

২। এক্স – রে পরীক্ষা :

( X – ray for Chest P.A.View ) খুব গুরুত্বপূর্ণ । সন্দেহ হলেই X – ray করানাে অবশ্য কর্তব্য । X – ray- তে –

  1. তুলাের মতাে সাদা দাগ ( wooly opacity ) ।
  2. সামান্য বা বেশি ।
  3. এক বা একাধিক ।
  4. একদিক বা দুদিকে ।
  5. Cavity- এর চিহ্ন থাকতে পারে – কঠিন অসুখ ।
৩। কফ পরীক্ষা :

(Sputam for Acid fast Bacillie করতে হয় । এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ । এটি পজিটিভ + ve হলে রােগ সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়া যায় ।

8। Mantoux Test ( Tuberculin Test ) –

1 in 10,000 dilution old Tuberculin.0.2 c . Intracutaneous Injec tion দিতে হয় ।

*৭২ ঘণ্টা পরে Injection স্থান ( সাধারণতঃ কনুইয়ের সম্মুখের দিকে ইঞ্জেকশন দেওয়া হয় ) পরীক্ষা করতে হয় ।

**স্থানটি যদি লাল , শক্ত ( ৮ মিলি বা বেশী ব্যাস ) হয় তবে পজিটিভ + ve , নতুবা Negative |

***Positive হলে বুঝতে হবে রােগ সংক্রমণ হয়েছে । রােগ সংক্রমণ মানেই রােগ নয় । জীবাণু শরীরে প্রবেশ করার পর তা দেহের প্রতিরােধ ক্ষমতার সঙ্গে লড়াই করে এবং লড়াইয়ে জীবাণুরা জয়ী হলে তবেই রােগ শুরু হয় । আর যদি জীবাণুরা মারা যায় তাহলে রােগ লক্ষণ প্রকাশ পায় না ।

****কিন্তু ২ বছরের কম বয়সের শিশুদের M.T ( Mantoux Test ) পজিটিভ + ve হলে যক্ষ্মারােগ হয়েছে বলেই ধরা হয় ।

৫ | ইতিহাস –

অর্থাৎ বংশে বা বাড়িতে অন্য কারাের যক্ষ্মারােগ আছে কিনা তা দেখতেহয় ।

উপসর্গ :

  • শুকনাে বা বুকে জলসহ প্লুরিসি ।
  • ফুসফুস ফেটে ধুকে বাতাস এ্যালােপ্যাথিক চিকিত্সা Tongue |
  • অন্ত্র – Intestine ।

*দেহে নানা অংশে যক্ষ্মা হতে পারে-

  • বাগ যন্ত্র – Larynx ।
  • জ্বিহা – Kidney ।
  • অন্ত্র – Intestine ।
  • অন্ত্রাবরক ঝিল্লি – Peritoneum ।
  • হৃদাবরন – Pericardium ।
  • বৃক্ক – Kidney ।
  • মুত্রস্থলী – Bladder ।
  • উপকোষ- Epididymis
  • মস্তিষ- Brain !
  • মস্তিষ্ক আবরক ঝিল্লী- Meninges ।
  • লসিক গ্রন্থি – Lymph Gland ।
  • অস্থি ও সদ্ধি– Bones & Joints |
  • তুক চামড়া —Skin ।
  • চক্ষু বা চোখ— Eyes |

চিকিৎসা :

১। যক্ষ্মারােগের চিকিৎসা:-

দীর্ঘস্থায়ী এবং ধৈর্য সাপেক্ষ।নিয়মিত ঔষধ ব্যাবহার অবশ্য কর্তব্য । ঔষধের সম্পূর্ণ কোর্স চালালে রােগ নিরাময় সম্ভব নয় চিকিৎসা কেমনভাবে হবে এবং তা কতদিন চালাতে হবে তা নিচে বিশদভাবে বিকৃত রা হলাে ।

( ক ) Rifampicn জাতীয় ঔষধ দিতে হবে । Isoniazid মিশ্রিত হলে ভাল হয় । Cap R – Cinex ( ক্যাপ আর – সিনেক্স ) ১ টি করে প্রত্যহ সকালে খালিপেটে । অথবা Cap Rifadin – INH ( ক্যাপ রিফাডিন আই.এন.এইচ . ) ১ টি করে প্রত্যহ সকালে খালিপেটে । অথবা Cap Tibirim – INH ( ক্যাপ টিবিরিম আই.এন.এইচ ) একটি করে প্রত্যহ সকালে খালিপেটে । অথবা Cap Rimpinah ( ক্যাপ রিমপিনা ) ১ টি করে প্রত্যহ সকালে খাবার আগে ।

( খ ) Ethambutol ট্যাবলেট অথবা Streptomycin ইঞ্জেকশন যে – কোন ১ প্রকার । Tab Combutol – 800 mg ( ট্যাব কবিউটল – ৮০০ মিগ্রা ) ১ টি করে দুপুরে খাবার পর।অথবা Tab Themibutol- 800 mg ( ট্যাব থেমিবিউটল — ৮০০ মিগ্রা ) ১ টি করে দিনে ১ বার দুপুরে খাবার পর । অথবা Tab Mycobutol – 800 img ( ট্যাব মাইকোবিউটল— ৮০০ মিগ্রা ) ১ টি করে প্রত্যহ ১ বার দুপুরে খাবার পর । অথবা Tab Lybutol – 800 mg ( ট্যাব লাইবিউটল – ৮০০ মিগ্রা ) ১ টি করে প্রত্যহ ১ বার দুপুরে খাবার পর । অথবা Inj . Streptomycin Sulph 0.75 gm ( ইঞ্জেকশন স্ট্রেপট্রোমাইসিন ০.৭৫ গ্রাম ) প্রত্যহ ১ টি করে ভায়াল ২ মাস পর্যন্ত অথবা Inj.Ambistryn – S – 0.75 gm ( ইঞ্জেকশন অ্যামবিসটিন – এস ০.৭৫ গ্রাম ) প্রত্যহ ১ টি করে ভায়াল ২ মাস পর্যন্ত ।

( গ ) Pyrazinamide জাতীয় ঔষধ Tab Pyzina 750 mg । ( ট্যাব পাইজিনা – ৭৫০ মিগ্রা ) ১ টি করে দিনে ২ বার খাবার পর । অথবা Tab PZA CIBA – 750 ( ট্যাব পি.জেড , এ – সিবা —৭৫০ ) ১ টি করে দিনে ২ বার খাবার পর । অথবা Tab Lynamide 750 ( ট্যাব লাইনামাইড -৭৫০ ) ১ টি করে দিনে ২ বার খাবার পর ।

( ক ) , ( খ ) এবং ( গ ) -এর চিকিৎসা নতুন রােগে ২ মাস চালাতে হবে । পরে ৪ মাস কেবলমাত্র ( ক ) -এর ঔষধ চালাতে হয় ।

*পুনরাক্রমণ ঘটে থাকলে বা অসমাপ্ত চিকিৎসা করে পুনরায় রােগ বাড়লে তখন ( ক ) , ( খ ) এবং ( গ ) এর ঔষধ ৩ মাস চালাতে হবে এবং পরে ৫ মাস ( ক ) এবং ( খ ) -এর ঔষধ সমূহ চালাতে হবে ।

**বর্তমানে বাজারে কিছু কোম্পানি ঐ সমস্ত ঔষধ ১ দিনের মাত্রা এক একটি প্যাকেটে ভরে বাজারে বিক্রয় করে ।

যেমন—
পুরাতন রােগে—

AKT – 4Combipack ( এ.কে.টি -৪ কম্বিপ্যাক ) ক্যাপসুলটি সকালে খালিপেটে , পাইরাজিনামাইভ দুটি দুপুর ও রাত্রে খাবার পর এবংইথামবিটল আইসােনিয়াজিত ট্যাবলেটটি দুপুরে খাবার পর খেতে হবে ২ মাস পর্যন্ত । পরে AKT – 3 Combipack ( এ.কে.টি -৩ কন্থিপ্যাক ) ক্যাপসুলটি সকালে খালিপেটে , ট্যাবলেটটি দুপুরে খাবার পর ৫ মাস পর্যন্ত ।

নতুন রােগে—

Rimactazid + Z ( রিম্যাকটাজাইড – জেভ ) লাল ট্যাবলেটটি সকালে খালিপেটে , সাদা দুটি দুপুর ও রাত্রে খাবার পর । অথবা Zucox – Kit ( জুক – কিট ) ক্যাপসুল ও ছােট ট্যাবলেটটি সকালে খালিপেটে এবং বড় ট্যাবলেট দুটি দুপুর ও রাত্রে খাবার পর , ২ মাস চালাতে হবে । এবং এরসাথে Inj . Ambistryn S – 0.75 gm ( ইঞ্জেকশন অ্যাবিসট্রিন – এস -০.৭৫ গ্রাম ) প্রত্যহ ১ টি করে ভায়াল ২ মাস পর্যন্ত । পরে ৪ মাস Zuox – Plus ( জুক প্লাস ) প্রত্যহ সকালে খালিপেটে ১ টি করে ক্যাপসুল ।

২ | মাল্টিভিটামিন ও মিনারেল জাতীয় ঔষধ দিতে হবে—

-Cap Becadexa min ( ক্যাপ বেকাডেক্সামিন ) ১ টি করে প্রত্যহ ১ বার সকালে খাবার পর । অথবা Tab Vimgran ( ট্যাব ভিমগ্রান ) ১ টি করে প্রত্যহ সকালে খাবার পর । অথবা Tab Supradyn ( ট্যাব সুপ্রাডিন ) ১ টি করে প্রত্যহ সকালে খাবার পর । অথবা Tab Cylatabs ( ট্যাব সিলট্যাবস ) ১ টি করে প্রত্যহ সকালে খাবার পর ।

৩। কাশির জন্য দিতে হবে–

Corex – Exp ( কোরেক্স – এক্সপেক্টোরান্ট ) ২ চামচ করে ৩ বার । অথবা Viscodine Exp , ভিসকোডাইন এক্সপেক্টোরান্ট ) ২ চামচ করে ৩ বার । অথবা Zeet Expectorant ( জিটু এক্সপেক্টোরান্ট ) ২ চামচ করে দিনে ৩ বার ।

৪। কফের সঙ্গে খুব বেশি রক্ত আসতে থাকলে দিতে হবে —

Inj.Chromostat ( ইঞ্জেকশন ক্রোমােস্ট্যাট ) ২ মিলি ইন্ট্রামাস্কুলার পথে । দিনে ২ বার । অথবা Inj . Styptochrome ( ইঞ্জেকশন স্টিপটোক্রোম ) ২ মিলি ইন্ট্রামাস্কুলার পথে দিনে ২ বার ।

*যতদিন না সম্পূর্ণরূপে রক্ত পড়া বন্ধ না হয় ততদিন দিতে হবে ।

**রােগীকে আশ্বাস দিতে হবে যে রক্ত পড়লেই রােগী মারা যায় না । পূর্ণ বিশ্রামে রাখতে হবে । খুব দুর্বল রােগী হলে Dextrose IV দিতে হয় ।

৫। Isolation —

অর্থাৎ রােগীকে পৃথক রাখার ব্যবস্থা করতে হয় । চিকিৎসা শুরু হওয়ার পরেও কমপক্ষে পনের দিন ঐ রােগীকে পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে মেলামেশা করতে না দেওয়া আবশ্যক । তার পরেও রােগীর কফু , মলমূত্র নির্জন জায়গায় মাটির নিচে পুঁতে ফেলা উচিত ।

*প্রথম অবস্থায় রােগীকে সম্পূর্ণ বিশ্রামে রাখতে হবে । কিন্তু প্রাথমিক রােগ লক্ষণ কমে গেলে রােগী হেঁটে চলে বেড়াতে পারে । ২-৩ মাস পরে রােগী হালকা পরিশ্রম করতে পারে ।

৬। খাদ্য :

যক্ষ্মারােগ  হলেই মাছ , মাংস , দুধ , ডিম , আপেল ইত্যাদির বন্যা বইয়ে দেওয়ার ধারণা সম্পূর্ণ বদলে গেছে । ধনীরা যা মন চায় তা খেতে পারে কিন্তু সাধারণ মানুষের পক্ষে নিচের খাদ্যই যথেষ্ট ।

সকালে রুটি –

তরকারি , দুটি পাকা কলা , সম্ভব হলে এক পােয়া দুধ ও একটি সেদ্ধ ডিম । দুপুরে – ভাত বা রুটি , পরিমাণমত ডাল , তরকারি , সম্ভব হলে এক টুকরাে ভাজা মাছ , দই , পাতিলেবু । বিকালে রুটি – তরকারি বা মুড়ি , একটা পেয়ারা , টম্যাটো , সম্ভব হলে কমলা বা মুশাম্বি লেবু । রাত্রে – ভাত অথবা রুটি , ভাল সম্ভব হলে মাছ , দুধ ইত্যাদি ।

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Change Language