স্বরযন্ত্রের ক্যান্সার এর কারণ, লক্ষন ও চিকিৎসা

স্বরযন্ত্রের ক্যান্সার এর কারণ, লক্ষন ও চিকিৎসা

স্বরযন্ত্রের ক্যান্সার :

স্বরযন্ত্রে ক্যান্সার আক্রমণ করলে , প্রথমে আক্রমণ করে গ্রাসনালী । এটি জিভের নিম্নভাগ থেকে পিছনে ও সামনে ত্রিকোণাকৃতি রূপে অবস্থিত । নিচের দিকে এটি আবার শ্বাসনালীর সঙ্গে যুক্ত থাকে । কতকগুলি ঝিল্লী এবং মাংসপেশীর দ্বারা এটি গঠিত । স্বরযন্ত্রের উপরে মাংসপেশীর একটি আবরণ থাকে । এই আবরণ থাকার ফলে , খাদ্যগ্রহণের সময় খাদ্য । অন্ননালী থেকে স্বরযন্ত্রে প্রবেশ করতে পারে না ।কিন্তু কোনপ্রকারে যদি খাদ্যদ্রব্য স্বরযন্ত্রে প্রবেশ করে , তাহলে কাশি হতে থাকে । চলতি ভাষায় আমরা একে বিষম লাগা বলি ।

কারণ :

আমাদের পূর্বপুরুষগণ এবিষয়ে ভালভাবেই জানতেন এবং তারা মনে হয় ;  আমাদের চেয়েও বিজ্ঞানে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন , সেজন্য তারা বলে গেছেন , আহার করার সময় কথা বলা শাস্ত্র বিরুদ্ধ ।

বর্তমানে পাশ্চাত্য সভ্য দেশগুলিতেও এই কথা স্বীকার করা হয়েছে । এর কারণ হলাে — খাবার সময় কোনও প্রকার অসাবধানতায় । খাদ্যবস্তু যেন শ্বাসনালীতে প্রবেশ না করে।

মদ্যপান ও ধূমপান স্বরযন্ত্রের ক্যান্সারের জন্য প্রধান দায়ী বলে নির্ণয় করা হয়েছে ।  এর কারণ অনুসন্ধান করে দেখা যায় যে , স্বরযন্ত্রের ক্যান্সার স্ত্রীলােক অপেক্ষা পুরুষদের মধ্যেই বেশী দেখা যায় ।

বিশেষতঃ

আমাদের ভারতবর্ষে মহিলা ;  মদ্যপায়ী ও ধূমপানকারিণীর সংখ্যা খুবই কম ; সেজন্য পাশ্চাত্য দেশ অপেক্ষা ; ভারতের নারীদের স্বরযন্ত্রের ক্যান্সার খুবই কম হয় ; সেই তুলনায় পাশ্চাত্য দেশে মহিলাদের স্বরযন্ত্রের ক্যান্সার খুব বেশী দেখা যায় ;  এর কারণ হিসাবে বলা হয়েছে ; যে , পাশ্চাত্য দেশে মহিলা মদ্যপায়ী ও ধূমপানকারি খুবই বেশী ।

বর্তমানে এদেশেও কিছু কিছু ভারতীয় উচ্চ শ্রেণীর মহিলা মদ্যপায়ী ও ধূমপায়ী হয়ে পড়ছেন ; এটা কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত অশুভদায়ক বলেই মনে আশঙ্কা হচ্ছে ।

স্বরযন্ত্রের ক্যান্সার যদ্যপি স্বরযন্ত্রেই হয় , কিন্তু অনেক সময় এই রােগের আরম্ভ হয় । জিভ ও গ্রাসনালীতে । এই যন্ত্রটির ভিতর এবং বাহির যে কোনও স্থানে হতে পারে; একটা কথা বলা যায় যে , ভেতরের ক্যান্সার ক্রমে ক্রমে বিকাশ লাভ করে , কিন্তু ; বাইরের ক্যান্সার তার চেয়ে অধিক দ্রুত বৃদ্ধি হতে থাকে ।

স্বরযন্ত্রের ক্যান্সার হবার লক্ষণ হলাে —

গ্রন্থি ফুলে যায় এবং গলার স্বরও পরিবর্তিত হয় ; কণ্ঠস্বর বেশী ভারী হয়ে যায় , তাছাড়া অল্প সময়ের মধ্যে গলা দিয়ে খাদ্যদ্রব্য পেটে যাওয়া খুবই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে ;  এরও কিছুদিন পরে স্বাস – প্রশ্বাস গ্রহণে কষ্ট দেখা দেয় । ঘাড়ে ও গলায় আবের ন্যায় বা শক্ত গুটির ন্যায় হতে থাকে ; গলা ও কানে প্রদাহ বা যন্ত্রণা হতে থাকে ।

  • ক্রমে ক্রমে শ্বাস – প্রশ্বাসে দুর্গন্ধ দেখা দেয় ।
  • কাশি হতে থাকে । কাশিতেও দুর্গন্ধ দেখা দেয় ; সেই সঙ্গে দুর্গন্ধযুক্ত কফ নিঃসরণ হতে থাকে ।
  • রােগ তীব্র আকার ধারণ করলে শ্বাস অবরােধ পর্যন্ত হয়ে যায় ।
  • তার ফলে রােগীর প্রাণ সংশয় হয়ে পড়ে।

অন্য স্থানের মতােই স্বরযন্ত্রের ক্যান্সারও এদিক ওদিক প্রসার লাভ করতে থাকে । আশ – পাশের অঙ্গগুলিতে জিভ ও অন্যান্য মাংসপেশীতে রােগ বিস্তার লাভ করতে থাকে ; এতে রােগীর ভােজন করতে অত্যন্ত কষ্ট হতে থাকে ।

লসিকা বাহিনীর মাধ্যমে এই রােগ গলার লসিকা গ্রন্থিগুলিকে আক্রমণ করে ও প্রসার লাভ করতে থাকে । এর ফলে মাথা ও কানে অসহ্য যন্ত্রণা শুরু হয়ে যায় ।

এই স্থান থেকে ক্যান্সার রােগের জীবাণু অগ্রসর হয়ে ফুসফুসে প্রসার লাভ করে । তার ফলে স্বাস – প্রশ্বাসে খুব কষ্ট হতে থাকে সেই সঙ্গে জ্বর দেখা দেয় ।

স্বরযন্ত্রের ক্যান্সার সন্দেহ হলে রােগীর গলায় ল্যারংস্কোপ লাগিয়ে তার পরীক্ষা করা হয় ; বায়ােপসীর সাহায্যেও এর পরীক্ষা করা যেতে পারে । এক্স – রে দ্বারাও রােগ পরীক্ষা করা যায় ; পরীক্ষার পরে যদি দেখা যায় যে , রােগ শুধুমাত্র স্বরযন্ত্রেই সীমিত আছে ।

তাহলে সাধারণতঃ

অস্ত্রোপচার করে রােগকে চিরদিনের জন্য বার করে ফেলে দেওয়া যায় । বিকিরণ ( Radium ) চিকিৎসার সাহায্যেও এই রােগকে একেবারে নষ্ট করে বা নির্মূল করে দেওয়া যায় বটে , কিন্তু যদি রােগ স্বরযন্ত্রের লসিকা গ্রন্থিগুলিতে প্রসার লাভ করে থাকে , তাহলে এই অবস্থায় অস্ত্রোপচার করা খুব সহজ সাধ্য নয় । এই অবস্থায় একমাত্র বিকিরণ ( Radium ) পদ্ধতিতেই চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হয়।

বিকল্প ব্যবস্থা :

রােগ তীব্র আকার ধারণ করলে , সেই অবস্থায় অস্ত্রোপচার প্রয়ােজন হয়ে পড়ে । কিন্তু যদি লসিকাগ্রন্থিগুলিতে রােগ ছড়িয়ে পড়ে , তার ফলে গ্রন্থিগুলি কঠোর এবং নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে , তাহলে সেই অবস্থায় বিকিরণ অর্থাৎ রেডিয়াম ( Radium ) চিকিৎসাই নয় , সেই সঙ্গে ঔষধাদি প্রয়ােগ একমাত্র বিকল্প ব্যবস্থা বলে জানতে হবে ।

অনেক সময় রােগ এত তীব্র আকার ধারণ করে যে , শাসনালীর সাহায্যে শ্বাস গ্রহণ অসম্ভব হয়ে পড়ে , এই অবস্থায় স্বাস – প্রশ্বাস গ্রহণের জন্য স্বতন্ত্র পথ তৈরী করে ;  দিতে হয় এবং এইভাবে রােগীকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যত্ন করা হয় ।

রােগীকে স্বাস – প্রশ্বাস গ্রহণের জন্য যে অপারেশন করা হয় তাকে ট্রাকিয়ােস্টোমী ( Traciostomy ) বলা হয় ; এই অপারেশনের দ্বারা অন্য স্থান বা পথ দিয়ে রােগীর স্বাস – প্রশ্বাস গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয় ।

চিকিৎসা :

এই অপারেশনে ঘাড়ের নিম্নস্থানে একটি ছােট ছিদ্র তৈরী করে দেওয়া হয় এবং আবার তার ভেতর ট্রাকিয়ােস্টামী টিউব লাগিয়ে দেওয়া হয় ; এটি ধাতুর সাহায্যে তৈরী বস্তু । এইভাবে লাগিয়ে দিলে রােগী তার সাহায্যে শ্বাস – প্রশ্বাস নিতে পারে ; এর বেল্টটি গলার সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হয় ; যখন প্রয়ােজন হয় , তখন এর ভেতরের টিউবটি পরিষ্কার করার জন্য বাইরে বার করে পরিষ্কার করে দেওয়া হয় ।

সাধারণতঃএই টিউব ধাতু দ্বারা তৈরী হয় , কিন্তু কখনও কখনও আবার পলিথিনের সাহায্যেও এটি তৈরী করা হয় ।

স্বরযন্ত্রের বৈকল্য শুধুমাত্র ক্যান্সারের জন্যই যে হয়ে থাকে , এমন কথা নয় , অন্যান্য রােগের কারণেও স্বরযন্ত্রের গােলমাল হয় । তবে এই অবস্থাতেও উপরােক্ত অপারেশন করতে হয় ; তবে যদি শ্বাস – প্রশ্বাসে বিঘ্ন হয় , তবেই এই অপারেশন করা হয়।

স্বরযন্ত্রের ক্যান্সার হলে যেমন সাবধানতা অবলম্বন করতে হয় , সেই রকম দেহের অপরাপর অঙ্গ – প্রত্যঙ্গে ক্যান্সার আক্রমণ করলেও সাবধানতা অবলম্বন করতে হয় ; কি তবে একথা স্বীকার করা হয়েছে এবং সর্বসম্মতিক্রমে বলা হয়েছে ; যে কিছু বিশিষ্ট অঙ্গের ক্যান্সার রােগের উৎপত্তির প্রধান কারণ হলাে ধূমপান এবং মদ্যপান ; অতএব এই দু’টি বদভ্যাস ত্যাগ করাই উচিত ।

যদি প্রথম আক্রমণেই পরীক্ষা – নিরীক্ষা করে ধরা যায় , তাহলে ভবিষ্যতে ভয়ঙ্কর ও প্রাণঘাতক পরিণতির হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যেতে পারে ।

বিশেষতঃ

আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে ক্যান্সারের চিকিৎসা , তা সে স্বরযন্ত্রের ক্যান্সার হােক্ অথবা গর্ভাশয় কিংবা যােনিদেশের ক্যান্সার হােক , অপারেশনের মাধ্যমেই করা হচ্ছে ; অপর পক্ষে দেশীয় চিকিৎসা পদ্ধতি ঔষধাদির পক্ষপাতী । কিন্তু তার প্রচার বা প্রসার খুবই কম ; আবার প্রায় ক্ষেত্রে অপারেশনের নাম শুনলেই রােগী তাে দূরের কথা , পরিবারবর্গও ভয় পেয়ে যান । এটাই হলাে সমস্যা ।

এই রকম উভয় সঙ্কট অবস্থার ভেতর দিয়ে দিন কেটে যাচ্ছে ক্রমে ক্রমে , এখন ; এম্ন অবস্থায় এসেছে যে — রােগ ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে আমাদের সামনে এসে দাড়িয়েছে ; অনেককেই বলতে শােনা যায় যে ক্যান্সার রােগী বাঁচে না , আর যে রােগী বাঁচবে না , তার অঙ্গচ্ছেদ করে কষ্ট দিয়ে লাভ কি ?

আনুসাঙ্গিক ব্যবস্থা :

মানুষের মনের এই ভ্রম আজও দূর করা সম্ভব হচ্ছে না । ভবিষ্যতেও দূর করা যাবে কিনা সন্দেহ দেখা যাচ্ছে । এই সন্দেহ দূর করার মতাে কোনও সুদৃঢ় আধারও সামনে পাওয়া যাচ্ছে না ; তবুও বক্তব্য হলাে — যে কোনও রােগ হােক , অথবা যারই । রােগ । না কেন , তাকে পরীক্ষা – নিরীক্ষা করে চিকিৎসা গ্রাই উচিত ।

অতএব পরীক্ষা করার ফলে ক্যান্সার রােগ ধরা পড়লে যথাবিধি অস্ত্রোপচার অথবা বিকিরণ ( Radium ) চিকিৎসা করিয়ে নিতে হবে ; যদি ঔষধাদি প্রয়ােগ সম্ভব হয় , তাহলে সেটাও করাতে হবে ; কিন্তু অপারেশন ও বিকিরণ ( Radium ) চিকিৎসার দ্বারা খুব শীঘ্র ফল পাওয়া যায় , এই কথাটা সর্বদা আমাদের মনে রাখতে হবে ।

অস্ত্রোপচারের নাম শুনে ভয় পাবার কোনও কারণ নেই ; স্বরযন্ত্রের ক্যান্সারে শ্বাস গ্রহণের অন্য স্থান করে দেওয়ার কথা শুনেও অনেক রােগী ভয় পান , তার ফলে অনেক সময় চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যায় ; সেজন্য এ ব্যাপারে রােগীকে সান্ত্বনা দিতে হবে ।

তাকে বুঝাতে হবে যে — রােগ নিরাময় হবার পর শ্বাস – প্রশ্বাস আবার মূল শ্বাসনালীর দ্বারাই হবে ; তখন এই কৃত্রিম শ্বাসনালীর ছিদ্র বন্ধ করে দেওয়া হবে । এবং রােগীর আর কোনও কষ্ট থাকবে না ।

পরিশেষে বলা যায় যে — আমাদের দেহে যাতে কোনও রােগ বাসা না বাধে ; তার জন্য আবশ্যকীয় সাবধানতা গ্রহণ করতে হবে। তবুও যদি রােগ আক্রমণ করে , তার জন্য ভয় না পেয়ে উপযুক্ত চিকিৎসা করাতে হবে ।

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Change Language